বুধবার, ২২ মার্চ, ২০১৭

হযরত সাঈদ বিন যায়েদ (রা)

হযরত সাঈদ বিন যায়েদ (রা)



(1) যার জন্য কাজ করি, তিনি জানেন:

কাদিসিয়ার যুদ্ধে হেরে গেছি, ব্যাবিলন থেকে সরে এসেছি- তাতে এমন কি হয়েছে ? রাজধানী মাদায়েন এখনো রয়ে গেছে আমাদের দখলে। হাজার হাজার সৈন্য আছে সেখানে। ইরানীরা নতুন করে সাহস সঞ্চয় করে। বারবার মুসলমানদের হাতে মার খেয়েও নতুন আশায় বুক বাধে । কেউ কেউ বলল - দজলা নদির নৌকা গুলো ডুবিয়ে দাও। ভেঙ্গে ফেল নদী পারাপারের সেতু । বন্ধ কর ওদের নদী পারাপারের সমস্ত পথ। এতকিছু করেও যেন ইরানীরা ভরসা পায় না। অগণিত সৈন্য মাদায়েনে এসে জড় হয়। নদীর ঘাটে, দুর্গের মধ্যে, শহরেরে আনাচে কানাচে তারা ওত পেতে বসে থাকে।

এদিকে মুসলিম সেনারা নদির ধারে এসে তো একেবারে থ। কোথাও নৌকা নেই। নদী পারাপারের সেতুটিও ইরানীরা ভেঙ্গে ফেলেছে। আশেপাশে কোথাও নৌকা মেরামতের, জাহাজ তৈরির মাল-মসলা পাওয়া গেল না। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে তারা স্পষ্ট শুনতে পায় শো শো গর্জন। প্রকান্ড ঢেউ গুলো একটার পর একটা আছড়ে পড়ছে। স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে বড় বর গাছ। সেনাপতি সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা) পড়ে গেলেন মহা সমস্যায়। কিন্তু পাহাড় সমান বাধাও মুসলমানদের আটকে রাখতে পারে না। খাঁটি মুসলমানেরা এখনো মৃত্যুকে পরোয়া করে না। তারা জানেনা পেছনে ফিরতে। যা কিছু মানুষের কল্পনার বাইরে, ঈমানের জোরে তাকেই মুসলমানেরা বাস্তবে  রুপ দেয়। সম্ভব করে তোলে অসম্ভবকে।

সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা০ বললেন- ভায়েরা আমার, শত্রুরা দাজলার ওপারে গিয়ে ঘাঁটি গেড়েছে। ছিন্ন করে দিয়েছে পারাপারের সমস্ত রাস্তা। ওরা কৌশলে আমাদের হটিয়ে দিতে চায়। আমরা চলে গেলেই ওরা আবার সচল হয়ে উঠবে। আমাদের নাজেহাল করবে নানাভাবে। তোমরা তৈরি হউ। আল্লাহর মানে ঝাপিয়ে পড় নদীর বুকে। 

"আল্লাহু আকবার" ধ্বনি তুলে প্রথমে ঝাপ দিলেন সেনাপতি সা'দ। অন্যরা তাকে অনুসরন করে। ঝাঁপিয়ে পড়ে দাজলার বুকে। শ্রোতের শো শো শব্দ ছাপিয়ে শোনা গেল ঝুপঝাপ আওয়াজ। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ইরানীরা এতক্ষন হাসাহাসি করছিল। কখন কিভাবে মুসলমানদের ওপর চড়াও হবে- একথায় ওরা ভাবছিল। সুসলমানদের এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখে ওরা আঁতকে ওঠে। কেউ কেউ চাপা গলায় বলে ওরা কি মানব না দানব ?

দেখতে দেখতে মুসলমানেরা মাঝ নদী পার হয়ে আসে। ভয়ে ভয়ে ইরানীরা চীৎকার করে ওঠে - দানব আসছে ! দানব আসছে !! যারা দুর্গের মধ্যে ছিল, রাজধানী বা রাজপ্রাসাদে ওঁত পেতে ছিল - তারাও শুনতে পেল এই ভয়াল চীৎকার। ইরানী সেনাপতি বলল - তৈরি হও তির ছোড়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ইরানীরা ততক্ষণে দৌড়াতে শুরু করেছে। যে যেদিকে পারে ছুটে পালায়। সম্রাট ও রাজধানী ছেড়ে পেছন দরজা দিয়ে পালিয়ে গেল। মুসলমানেরা রাজধানী মাদায়েনে প্রবেশ করল। দখল করে নিল রাজপ্রাসাদ। হঠাত করেই একজন সৈনিকের নজরে পড়ল অতি দামি একটি জিনিস। ইরানী শাহানশাহের রাজমুকুট। দামী দামী অনেক মণি-মুক্তা বসানো থাকে মুকুটে। এই মুকুট যার মাথায় থাকে তিনি হলেন দেশের সম্রাট। সৈনিক টি অতি যত্নে মুকুট টি হাতে তুলে নিলেন। সকলের অগচরে তিমি মুকুট টি তুলে দিলেন সেনাপতি সা'দ বিন আবু অয়াক্কাস (রা) হাতে। সৈনিকের সততায় সা'দ অবাক হলেন। বললেন তুমি কে? কি তোমার নাম? সোনিকটি নাম বললেন না। পরিচয় দিলেন না। মুখটি পর্যন্ত ভালোভাবে দেখালেন না। দরজার দিকে মুখ করে বিনয়ের সঙ্গে বললেন- আপনার কাছে নাম বলে কি লাভ? যার জন্য আমি এ কাজ করেছি তিনি আমার নাম জানেন। কথা কয়টি বলে সৈনিকটি শা শা করে বেরিয়ে গেলেন। শত চেষ্টা করেও সা'দ তার নাম জানতে পারলেন না। পরিচয় খুজে পেলেন না। 

এমনি ছিল রাসুল (সা) এর সাহাবাগনের আচার-আচারণ। সুনাম সুখ্যাতির কোন লোভ তাদের ছিলনা। নিজেদের ভালো কাজগুলি জানাজানি হতে দিতেন না। তারা কাজ করতেন আল্লাহ কে খুশি করার জন্য। বিনিময়ে চাইতেন আল্লাহর কাছে। রাসুল (সা) এর সেই হাদিসটি মেনে চলতেন অক্ষরে অক্ষরে- " এমনভাবে দান কর, যাতে ডান হাত দিয়ে দান করলে বাম হাত টের না পায়।" 

সাঈদ বিন যাইয়েদ (রা) ছিলেন তাদেরই একজন। ইসলাম গ্রহণ করার কারনে কাফিরদের হাতে নির্যাতন ভোগ করেছেন। দিন কাটিয়েছেন খেয়ে না খেয়ে। এখনো আবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিহাদ করছেন, দেশ শাসন করছেন, শরিক হয়েছেন ইসলাম প্রচারের কাজে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তার নাম খুব কমই লেখা আছে। অথচ তিনি ছিলেন আশারা মুবাশশারা বা দশ জান্নাতীর একজন। দুনিয়াতে থাকতেই যারা পেয়েছিলেন বেহেশতে যাওয়ার সুসংবাদ। মোট দশজন সাহাবীকে 'আশারা মুবাশশারা' বলা হয়ে থাকে। আরবিতে আশারা মানে দশ আর মুবাশশারা মানে সুসংবাদ প্রাপ্ত।

কে জানত যে সাইদ (রা) এত বড় হবেন! কেউ কি ভাবতে পেরেছিলেন যে এই সাঈদ হবেন ইসলামের একজন প্রথম কাতারের সৈনিক, রাসুল (সা) এর একজন ঘনিষ্ঠ সাহাবা। আর সে কারনেই সাঈদ কখন কবে জন্মগ্রহণ করেন কেউ তা মনে রাখেনি। প্রয়োজন বোধ করেনি লিখে রাখার। তবে অনুমান করা হয় যে ছয়শত এক সালে মক্কায় কুরাইশ বংশে জন্ম গ্রহণ করেন। সেই হিসেবে তিনি রাসুল (সা০ এর চেয়ে ত্রিশ বছরের ছোট। মাত্র পনের কি ষোল বছর বয়সে তিনি নবীজীর হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করেন। সাঈদের পিতার নাম যায়েদ। মায়ের নাম ফাতেমা বিনতে বাজাহ। 

(2)অন্ধকার যুগের খাটি মানুষ:
সাঈদের পিতা যায়েদের অবস্তা খুব বেসি ভাল ছিল না। খেয়ে পরে কোন রকমে দিন কাটাত। কিন্তু যায়েদের মনটি ছিল খুবই বড়। সমাজের ভাল মন্দ, উচিত-অনুচিত বিষয়গুলো নিয়ে গভির চিন্তা করতেন। অন্যরা যখন মদ খেত, জুয়া খেলত, সরাইখানায় নাচে-গানে মেতে উঠত, যায়েদ তখন নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কে এই গাছ গাছালি, পাহাড় পর্বত সৃষ্টি করলেন? কার হুকুমে ফসল ফলে? কলকল শব্দ করে ঝরনার ধারা নেমে আসে কার ইশারায়? দেবতার ক্ষমতা কতটুকু? মানুষ মেরে কি লাভ? এসব বিষয়ে তিনি চিন্তা করতেন। চিন্তা করতে করতে দিশেহারা হয়ে পড়তেন। চিন্তার জগতে বারবার হাবুডুবু খেতেন। কিন্তু কুল-কিনারা পেতেন না।

আসলে এই চিন্তাগুলোই যায়েদ (রা) কে খাঁটি মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিল। তাকে সরিয়ে রেখেছিল অন্ধকার যুগের বর্বরতা এবং অনাচারের পংকিলতা থেকে। কাফির মুশরিকদের মধ্যেও বসবাস করেও তিনি এখনো কুফরি করেননি, শিরক করেননি। এমনকি মুশরিকরা দেবতার নামে ছাগল, ভেড়া বলি দিলেও তিনি তা স্পর্শ করতেন না।

রাসুল (সা) এর ওপর তখনো অহি নাযিল হয়নি। সে সময়কার একটি ঘটনা। আরবের একটি এলাকার নাম ওয়াদীয়ে বালদাহ। কি এক কাজে রাসুল (সা) সেখানে গেলেন। চেনাজানা লোকেরা তাকে খাবার খেতে দিলেন। সাঈদের পিতা যায়েদ (রা) ও সেখানে ছিলেন। নবীজী খোজ নিয়ে জানলেন- পশুটিকে দেবতার নামে বলি দেয়া হয়েছে। অমনি তিনি মাংসের টুকরোগুলো বাটিতে তুলে রাখলেন। বললেন মুর্তির নামে জবাই করা মাংস আমি খাই না। যায়েদেরও সেই একই কথা। তিনিও মাংস গ্রহণ থেকে বিরত থাকলেন। সেই অন্ধকার যুগেও এমনি নিখাদ ছিল যায়েদ (রা)- এর জীবন। 

(3) তিনি ছিলেন অতি দয়াবান:
সে আমলে মেয়েদের কোন কদর ছলনা। সমাজে কেউ তাদের দাম দিত না। মক্কার লোকেরা তাদের মেষ, ছাগল ও ঘোড়াগুলো যত যত্নের সঙ্গে লাল্লন-পালন করত, মেয়েদের ততটুকু যত্ন করত না।। মহিলাদের তারা মারধর করত যখন তখন। নানী-দাদী, মা-মামীরা ঠিকমতো কাজ না পারলে, পুরুষদের কথা না শুনলে ঘাড় ধরে ঘর থেকে বের করে দিত। তাড়িয়ে দিত বাড়ি থেকে। কখনো আবার যেনতেন দামে বিক্রি করে দিত বিদেশিদের কাছে। কারো ঘরে কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তো আর কথাই নেই। আতুড়ঘরেই তাকে গলা টিপে, নয়ত মাটিতে চাপা দিয়ে মেরে ফেলত। কখনো কখন পুরুষেরা কঠিন শর্তে মেয়েদের বিয়ে করত। বলত- যদি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়, তাহলে সমস্ত আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত দিতে হবে। দেশের বাছা বাছা নেতারাও থাকবে এখানে। সবার সামনে মা মেয়েকে নিজের হাতে গলা টিপে, নয়ত বুকে ছুরি চালিয়ে হত্যা করবে। রাজী তো? রাজী না হয়েই বা উপায় জি? কে তার মেয়েকে আইবূড়ো করবে ঘরে রেখে? মক্কার লোকেদের এসব কাজ করবার যায়েদের একদম ভাল লাগে না। এসব দেখে দেখে একেবারে হাপিয়ে উঠেন তিনি। কখনো কখনো লোকনকে বোঝান। সুযোগ পেলে প্রতিবাদ করেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা? উল্টো তাকেই নাকানি-চুবানি খেতে হয়। তাকে শুনতে হত তাদের হাজার রকমের গালমন্দ।
তবু যায়েদ (রা) এর মন মানে না। মা-বোনদের অসহায় অবস্তা, কন্যা সন্তানদের করুণ পরিনতির কথা ভাবতে গেলেই তার প্রাণ কেঁদে উঠে। তিনি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ান। যদি শোনেন যে কারও কন্যা সন্তান হয়েছে, তাকে মেরে ফেলবে আঁতুড়ঘরে, তখনি তিনি ছুটে যান সেখানে। মেয়ের পিতার হাতে-পায়ে ধরে মেয়েকে নিয়ে আসেন নিজের বাড়িতে। আদর যত্ন করে লালন-পালন করেন। যখন বড় হয় মেয়েকে নিয়ে যান আসল বাবা-মায়ের কাছে। বলেন- যদি চাও মেয়েকে ফিরিয়ে নিতে পার। নইলে রেখে দাও আমার কাছে। বাবা-মা কখনো মেয়েকে গ্রহণ করে, কখনো আবার দূর দূর করে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়। যায়েদ (রা) তখন নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। দেখে শুনে নিজের খরচে মেয়ের বিয়ে দেন। বিনিময়ে তিনি কিছু গ্রহণ করেন না। একটি পয়সাও নেন না কারো কাছ থেকে। 

(4)মার খেলেন কুরাইশদের হাতে:
দিন যত যায় কুরাইশদের সঙ্গে যায়েদের মতভেদ তত বাড়তে থাকে। কুরাইশদের আচার-আচরণ,কাজ-কারবার, চিন্তাভাবনা কোনকিছুইযায়েদ (রা) এর ভাল লাগেনা। কুরাইশরা যা করে, যায়েদ তা পছন্দ করেন না। যায়েদ যা চান, কুরাইশরা তার ধার দিয়েও হাটে না। অবশেষে এমন হল যে, যায়েদ যখন তখন তার মনের কথা গুল বলে ফেলেন। এ নিয়ে যায়েদের মাঝে মধ্যেই বিপাকে পড়তে হয়। কখনো বা খেতে হয় কিল-ঘুষি, চড়-থাপ্পড়। মক্কার একটি উৎসবের সময় ঘটে যায় এমনি একটি ঘটনা।

প্রতিবছরের মত এ বছরেও কা'বা প্রাঙ্গনে মেলা বসবে।। দূর দূর থেকে লোকজন আসবে। নারীপুরুষের কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠবে কা'বার প্রাঙ্গণ। দেখতে দেখতে উৎসবের দিন ঘনিয়ে এল। মক্কার আনাচে কানাচে হৈ হৈ রব পড়ে গেল। ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে বাজারে যায়। হরেক রকমের সওদা কেনে। নিজেরা সাজে, পশুগুলোকে সাজায়।

উৎসবের দিন হাটি হাটি পাপা করে যায়েদও গিয়ে হাযির হলেন কা'বার প্রাঙ্গণে। তার কোন সাজ নেই। গায়ে উথেনি নতুন পোশাক। ভেড়া-ঘোড়া, উঠ-গাধা কিছুই সঙ্গে নেই। কা'বা ঘরের পাশে দাড়িয়ে থাকেন তিনি। আস্তে আস্তে ভিড় বাড়ছে। দলে দলে জমায়েত হচ্ছে নারীপুরুষ। বিচিত্র সাজে তারা সেজেছে। পুরুষেরা মাথায় বেঁধেছে দামী রেশমি পাগড়ী। গেয়ে জড়িয়েছে মূল্যবান ইয়ামনি চাদর। নারী ও শিশুদের গায়ে হরেক রকমের পোশাক। হাটে, পায়ে, গলায়-মাথায় দামী দামী গয়না। সাজের বাহার থেকে পশুগুলোও বাদ পড়ল না। ধুয়ে মুছে গাধা-ঘোড়ার গা পরিস্কার করেছে। কোনটির গলায় ফুলের মালা, কপালে শরীরে দামী রঙ্গীন কাপড়। কোনটিকে আবার লাল-নীল চমৎকার ভাবে সাজিয়েছে। কা'বা ঘরের প্রাঙ্গণে নানা বর্ণে নানা রঙ্গে রঙ্গিন হয়ে ওঠে। সাজের সে বাহার দেখলে চোখ ঝলসায়। মন ফুরফুর করে। ছেলেমেয়েদের মনে তখন সে কি আনন্দ। তারা হাত ধরাধরি করে হাসে-নাচে, গান গায়। ঠেলতে ঠেলতে ভেড়া-ঘোড়া, ঊট-গাধাগুলো নিয়ে দেব-দেবির সামনে। ঝকঝকে ছুরিগুলো বারবার শান দেয়। হাতের আঙ্গুলে ধার পরখ করে দেখে। একটু পরেই পশুগুলোরে গলায় ছুরি চালাবে। বলি দেবে দেব-দেবীর নামে।

দূরে দাঁড়িয়ে যায়েদ (রাঃ) সবকিছু দেখেন। একে একে তার মনে জেগে ওঠে হাজার প্রশ্ন। দেবতাদের কি শক্তি আছে? ওগুলো তো কাদা-মাটি-পাথর দিয়ে আমরাই বানিয়েছি। সেই কবে থেকেই তো ওরা ওভাবে দাঁড়িয়ে আছে। একটু নড়েও না চড়েও না। আমরাই তো মাঝে মাঝে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে নেই। ঝাড়মোছা করে পরিস্কার করে রাখি। আমরা এত সাজি, এত হাসি, গান গাই। কই, ওরা একবারও সাড়া দেয়না। ওরা আমাদের কি এমন ভালো করেছে? অনিষ্ট করার ক্ষমতাই বা ওদের কোথায়। যে ভালো মন্দ কিছুই করতে পারেনা- তার সামনে মাথা নত করে কি লাভ? কি হবে পশুগুলো বলি দিয়ে? কিন্তু কাকে তিনি প্রশ্ন করবেন? কে দেবে তার প্রশ্নের উত্তর?

যায়েদ (রা) তবু নিরব থাকতে পারেন না। ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে পড়েন। দেবদেবীদের পাশে, যেখানে দাঁড়িয়ে পশুগুলো বলি দেবে, সেখানে গিয়ে দাঁড়ান। কা'বা ঘরের দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে বলেন- ভাইয়েরা আমার। শোন একটা কথা দেবতাদের আমরাই বানিয়েছি। কিন্তু পশুদের কে বানিয়েছে? আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ছে। জমিনে ঘাস বড় হয়েছে। দেবতাদের কি করার আছে? ওরা কি এগুলো বানিয়েছে না বাঁচিয়ে রেখেছে? তোমরা কার জিনিস কাকে দান করছো? এটা তোমাদের কেমন আহাম্মকি? একদমে কথা গুলো বলে যায়েদ (রা) থামলেন। যারা হাসাহাসি নাচানাচি করছিল তারা এসব কথা শুনতে পেল না। কিন্তু যারা পশুগুলো বলি দ্যার জনয তৈরি হচ্ছিল, তারা ঠিকমত শুনতে পেল। উমর (রাঃ) এর পিতা খাত্তাবও ছিলেন সেখানে। যায়েদের কথাগুলো শুনতেই তার মেজাজ বিগড়ে যায়। হাটে পশুটি ছেড়ে দিয়ে রাগে গড় গড় করতে করতে ছুটে আসেন যায়েদের কাছে। দাঁতে দাঁত চেপে, চোখ মুখ কিটমিট করতে করতে বললেন-এমন অলক্ষুণে কথা আর কত শুনব। আমাদের তো সহ্যের একটা সীমা আছে। যা হতভাগা! তোর সর্বনাশ হোক। কথাগুলো শেষ হতে না হতেই যায়েদের গালে বসিয়ে দেন এক থাপ্পড়। যায়েদ (রাঃ) নিরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ তাকে সাহায্য করল না। দাড়াল না তার পাশে এসে। বরং তারা যেন খুশিই হল। হেসে উঠল হোহো করে।

(5) তাড়িয়ে দিল গ্রাম থেকে:
যায়েদ (রা) কে থাপ্পড় মেরেই তারা শান্ত হল না। মক্কার যুবকদেরকে যায়েদের পেছনে লেলিয়ে দেয়। যায়েদকে দেখলেই তারা আজেবাজে নানান কথা বলে। কোন না কোন ভাবে ঝগড়া বাঁধানোর বাহানা খোঁজে। এদিকে সবাই মিলে যায়েদ (রা) কে একঘরে করে ফেলল। যায়েদ কারো কাছে গেলে, কারো বাড়িতে গেলে কেউ তার সঙ্গে কথা বলে না। পারলে দুরদুর করে তাড়িয়ে দেয়। পথে ঘাঁটে দেখা হলে মুখ ভার করে থাকে। যায়েদ (রা) গায়ে পড়ে দশটি কথা বললে একটি কথার জবাব আসেনা। যায়েদ (রা) এর তবুও বিরাম নেই, যখন যা মনে আসে তখন তাই বলেন। এদিকে খাত্তার, শোহেলী এবং অন্যান্য সরদারদের জেদ বাড়তে থাকে। সবাই মিলে স্থির করল ছলে বলে কৌশলে যে করেই হোক, যায়েদ (রা) কে দেশ ছাড়া করতে হবে। নইলে আমাদের রক্ষা নেই।  দেবতারা একবার রেগে গেলে হাজার গাধা বলি দিয়েও থামানো যাবেনা। গোটা দেশটাই তখন লাটে উঠবে। আমাদের জীবনেও নেমে আসবে চরম দুর্দিন।

যায়েদ (রা) কি আর করেন। বাধ্য হয়ে বাড়ি ঘরের মায়া, ছেলেমেয়েদের মায়া বিসর্জন দিলেন। আশ্রয় নিলেন হেরা পাহাড়ে।  সেখানেই কাটারে লাগলেন নিঃসঙ্গ দিনগুলো। সরদারেরা তাকে তাড়িয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না। তিনি যাতে আর ফিরে না আসতে পারেন, কেউ যাতে তার কাছে না যায়- সে ব্যাবস্থাও করল। শহরের শেষ সীমানায় কয়েকজন যুবককেও বসিয়ে দিল। বলে দিল যে- যায়েদের চোখে চোখ রাখবে। ওকে মক্কায় আসতে দেবে না। আসতে চাইলে আচ্ছা রকম পিটিয়ে ঠ্যাঙ ভেঙ্গে দেবে।

(6) গোপন পরামর্শঃ
সরদারদের কথামত যুবকেরা শহরের শেষ সীমানায় বসে থাকে। আনন্দ ফুর্তি করে। মদ খায়, মাতলামি করে। যায়েদ (রা) ও তাকে তাকে থাকেন। হঠাত করেই একদিন যুবকদের দৃষ্টি এড়িয়ে সকলের অগোচরে চলে আসেন শহরে। ওয়ারাকা ইবনে নাওফল আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাম এবং উসমান ইবনুল হারিসের সঙ্গে তার বেশ ভাব ছিল। তিনি চুপি চুপি এদের সঙ্গে দেখা করেন। আলাপ করেন দেশের হালচাল ও গোমরাহী সম্পর্কে।
শুরু হল আলাপ আলোচনা যুক্তি তর্ক। অবশেষে যায়েদের সঙ্গে সবাই একমত হলেন। যায়েদ বললেন আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, এ জাতি অধঃপতনের শেষ সীমানায় পৌছে গেছে। আসল ধর্ম কে বিকৃত করেছে। কুপ্রথাকে পরিনত করেছে ধর্মের মূল বিষয়ে। এভাবে আমরেয়া বাচতে পারব না। যদি ধ্বংস থেকে নাজাত পেতে চাম, তাহলে চলুন- আমরা দ্বীনের খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। তড়িঘড়ি করে তিনজনই তৈরি হলেন। ঘর ছাড়লেন সত্যের সন্ধানে।

Book: বেহেশতের সুসংবাদ পেলেন যারা।
Part: One
Writter: মুহাম্মদ লুতফুল হক। 

সংস্কৃতি


ইব্রাহীম (আঃ) কে আগুনে ফেললে, আগুন মহান আল্লাহর নির্দেশে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। স্থানটি বর্তমান তুরস্কের শানলি উরফাতে অবস্থিত। ছবিতে সেই স্থানটিতে প্রবেশের দরজা।

চিকিত্সা ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলমান উনাদের শুধুমাত্র অবদান নয়, উনারাই সৃষ্টিকরক/উদ্ভাবক-০৩ বোখারা নগরীতে জন্মগ্রহন করেছিলেন ইবনে সীনা এবং ১০ বছর বয়সেই কুরআন শরীফ ও সমকালীনঅন্যান্য বিজ্ঞানে বুৎপত্তি অর্জন করেন । আর মাত্র ১৭ বছর বয়সে চিকিৎসাবিজ্ঞানে আগ্রহী হয়ে উঠেন। এ বিষয়ে উনার অনুসন্ধিৎসা এত প্রবল ছিল যে, পরের বছর হতেই চিকিৎসক হিসেবে উনার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। ২১ বছর বয়স হতে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার আলোকে গ্রন্থ রচনা করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর রচিত ১৬টি মৌলিক গ্রন্থের ১৫টিতে তিনি বিভিন্ন রোগের কারন ও চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন। হৃদ্রোগের কারন হিসেবে তিনিই প্রথম মানুষের মানসিক অবস্থাকে(রাগ, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি) দায়ী করেন। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় তিনি মানসিক প্রশান্তির সাথে সাথে ঔষধ হিসেবে বিভিন্ন লতা-গুল্ম ও অন্যান্য বস্তুর বিবরণ দিয়েছেন। এছাড়া, আজকের মনো- চিকিৎসা (psyco-therapy) তাঁর হাত দিয়েই যাত্রা শুরু করে। কিন্তু, যে একটি গ্রন্থ উনাকে অমর করেছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকাৎসাবিদ হিসেবে, সেটির নাম ‘কানুন ফি-তিব্ব’।  
মানবসভ্যতায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এর চেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থ এখনও পর্যন্ত আর দ্বিতীয়টি নেই। ৫ খন্ডে এবং ৮০০ পরিচ্ছেদে সমাপ্ত এই চিকিৎসা বিশ্বকোষে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতকে যেন একসাথে বেঁধে ফেলেছেন। প্রথমখন্ডে রয়েছে শরীরতত্ত্ব(Physiology) ও স্বাস্থ্যতত্ত্বের(Hygiene) মৌলিক আলোচনা। দ্বিতীয় খন্ডে ৭৫০ টি গুল্ম, পানীজ ও খনিজ ঔষধের বর্ণনা। এজন্য তিনি গ্রীক, রোমান, চীনা এবং ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতির সার নির্যাস সংগ্রহ করেন। তৃতীয় খন্ডে মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের একাধিক রোগ এবং সেগুলোর উপসর্গ (Symptom), নির্ণয় (Diagnosis), পূর্বাভাস (prognosis) এবং কারণতত্ত্ব (Etilogy) নিয়ে তিনি বিশদ আলোচনা করেছেন। এক্ষেত্রে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, তিনি মাথা হতে শুরু করে ধীরে ধীরে চোখ, কান, নাক, মুখ, দাঁত- এভাবে নিচের দিকে নেমে এসেছেন। চতুর্থ খণ্ডে বিশেষকিছু রোগ যেমন- জ্বর, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া, ভয়, বেদনা, প্রদাহ, পচন, বসন্ত, যক্ষ্মা, হাড়ের ভাঙ্গন বা স্থানচ্যুতি, বিষক্রিয়া, ফোঁড়া, ঘা, চুল-নখ-চামড়া বিভিন্ন রোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। সর্বশেষ খন্ডে অন্তর্ভূক্ত করেছেন বিভিন্ন রোগের ব্যবস্থাপত্র, বড়ি, পাউডার ও সিরাপসহ নানান প্রকারের ঔষধসামগ্রী। সঙ্গতকারনেই, এ গ্রন্থটি বিপুলভাবে সমাদৃত এবং সর্বশ্রেষ্ঠ। সমগ্র এশিয়া এবং ইউরোপে এ পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর উপরে কোন কথা নাই। ইউরোপে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইবেল (Bible of Medicine) নামে সমাধিক পরিচিত। এতে উল্লেখিত অনেকগুলো ঔষধ আজো হুবহু ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন রোগের কারন, উপসর্গ এবং ব্যবস্থাপত্র আজো অপরিবর্তিত রয়েছে। এজন্য তাঁকে একবাক্যে সবাই চিকিৎকদের  চিকিৎসক(Doctor of doctors) বলে অভিহিত করেন। চক্ষুচিকিৎসায়ও মুসলমানদের মৌলিক আবিষ্কাররয়েছে।  আবুল কাসিম আম্মার ইবন্ আলী আল- মাওসুলী চোখের ছানি অপারেশনে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। জর্জসার্টনও উনাকে জগতের সর্বপ্রথম মুসলিম চক্ষুচিকিৎসক (The most original of Muslim oculists) বলে অকপটে স্বীকার করেছে। আলি ইবন্ ঈসা (৯৪০-১০১০) ছিলেন এ ব্যাপারে সকলের উপরে। উনার ‘তাজকিরাতুল কাহ্হালিন’ চক্ষুচিকিৎসায় সবচেয়ে দূর্লভ ও মূল্যবান গ্রন্থ যাতে চোখের ১৩০টি রোগ এবং ১৪৩টি ঔষধের বর্ণনা জায়গা পেয়েছে। তিনিই প্রথম চোখের রোগের সাথে পেট ও মস্তিষ্কের রোগের সম্পর্কিত হওয়ার বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেন।

প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ইবন্ হাইসামও (৯৬৫-১০৩৯)
এক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। চোখের ব্যবচ্ছেদকরণের(Anatomy) মাধ্যমে তিনি এর বিভিন্ন অংশ যেমন- রেটিনা, কর্ণিয়া, আইরিস্ ইত্যাদি আলাদা করে চিহ্নিত করে দর্শনে(View) এদের কাজের বর্ণনা দেন। আরেকজনের এ বিষয়ে বেশ দক্ষতা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি হলেন আবু হাসান আলী ইবন্ আবিল ইবন্ নাফিস । চক্ষুরোগ এবং ঔষধের উপরে তাঁর দুইটি মৌলিক গ্রন্থ রয়েছে। কিন্তু, যে কাজেরজন্য তিনি অমর তা হচ্ছে, মানবদেহের রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়ার আবিষ্কার। এক্ষেত্রে তিনি ইবন্ সীনার মতকেও উপেক্ষা করেন এবং উনার আবিষ্কৃত মতবাদটিই আধুনিক যুগে প্রতিষ্ঠিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলমানদের অগ্রগতির ক্ষেত্রে কয়েকটি পরিবারের অবদান সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। ক) সাবিত ও সিনান পরিবার। তাদের মধ্যে সাবিত ইবন ক্বুরা(৮৩৬-৯০১) এবং উনার পুত্র সিনান ইবন্ সাবিত ও পৌত্র ইবরাহিম ইবন সাবিত (৯০৮-৯৪৬) সবচেয়ে বিখ্যাত। খ) জুহর পরিবার। যাঁরা প্রায় তিন শতাব্দী এবং  ছয় পুরুষ ধরে স্পেনে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবদান রাখেন এবং আবদুল মা’লিক ইবন্ জুহর সবচেয়ে বিখ্যাত। উনার পুত্র, কন্যা, দৌহিত্র সকলেই চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। চতুর্দশ শতকে মুসলমানদের ক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞানেও আধিপাত্য কমে যেতে থাকে। চুরি হয়ে যায় অনেক খিউরী। তার মাঝেও ফিলিস্তিনী আবু সাঈদ আল আফিক, স্পেনেরমুহম্মদ ইবন্ মুহম্মদ, তুর্কী আলী হাজালী, হাজী পাশার মত চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা টিমটিমে হয়ে জ্বলতে থাকেন।
(সংগৃহীত)

রাশিয়ায় মুসলিমদের ইতিহাস ।

অস্থিত্ব রক্ষার সংগ্রামে ক্রিমিয়ার তাতার মুসলমান রুশ বলয়ভূক্ত ক্রিমিয়ার ঐতিহ্যসমৃদ্ধ তাতার মুসলিম জনগোষ্টী তিন শ’ বছরের বাধা-বিপত্তি ও গোলামীর জিঞ্জির ছিড়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সংগ্রামে বিজয়ী হতে চলেছে। অব্যাহত নিপীড়ন, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও গণ নির্বাসন চালিয়েও তাতারদের মুসলিম জাতিসত্ত্বা মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। আবার তারা জেগে উঠছে ধর্ম ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নিজস্ব বলয়ে। কৃষ্ণ সাগরের উপকূলে আবার দেখা দিয়েছে ইসলামী নবজাগরণ। নতুন নতুন মসজিদ ও ইসলামী কেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে এবং আনুপাতিক হারে বেড়ে চলেছে নামাযীদের সংখ্যা। উত্তরাধিকার ঐতিহ্য ও তাওহিদী চেতনায় জীবন গড়ার তাগিদ তীব্রভারে অনুভূত হচ্ছে তাতারদের মাঝে। হারিয়ে যাওয়া তাতার ভাষার পুনরুজ্জ্বীবনের জন্য ক্রিমিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গড়ে উঠেছে তাতার ভাষা স্কুল।

ভৌগলিক অবস্থানঃ ক্রিমিয়ান তাতার হচ্ছে কৃষ্ণ সাগরের উত্তর উপকূলে অবস্থিত ইউক্রেনের একটি স্বায়িত্বস্বাসিত প্রজাতন্ত্র। বহু উত্তান পতনের নীরব সাক্ষী ক্রিমিয়া। ক্রিমিয়ার এ বিস্তীর্ণ অঞ্চল শত বছর ধরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও শাসকদের দ্বারা শাসিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। ২৬, ২০০ কিলোমিটারের আয়তন বিশিষ্ট ক্রিমিয়া প্রজাতন্ত্রের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৯, ৭৩, ১৮৫ জন। ক্রিমিয়া হচ্ছে ক্রিমিয়ান তাতারদের জন্মভূমি, যারা নৃতাত্ত্বিকভাবে সংখ্যালঘু। গোটা  জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ ক্রিমিয় তাতার। ক্রিমিয়ান তাতারদের পূর্বপুরুষ হচ্ছে তুর্কী। ত্রয়োদশ শতাব্দী হতে তারা ক্রিমিয়ান উপদ্বীপে বসবাস করে আসছে।

পূর্বের অবস্থানঃ মূল তাতারগণ পঞ্চম শতাব্দীতে গোবী মরুভূমির উত্তর পশ্চিমে বসবাস করত। নবম শতাব্দীতে খিতানগণ তাদের এলাকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলে তারা দক্ষিণ অভিমূখে যাত্রা করে। চেঙ্গিস  খানের নেতৃত্বে মোঙ্গল শাসন কায়েম করে। চেঙ্গিস খানের দৌহিত্র বাতু খানের পরিচালনায় তাতারগণ পশ্চিম দিকে রাশিয়ার সমতল অভিমূখে রওনা হয়। যাত্রার সময় তারা তাদের সাথে তুর্কী উরাল বংশোদ্ভুত জনগণকেও সাথে নিয়ে যায়। চেঙ্গিস খানের বংশধর বার্কাই খানের (১২৫৭-১২৬৭) আমলে তাতারদের সাথে ইসলামের পরিচয় ঘটে।

ইসলামে প্রবেশঃ উযবেগের (১৩১৩-১৩৪০) ক্ষমতায় আরোহণের আগ পর্যন্ত এতদঞ্চলে ইসলাম ব্যাপকতা লাভ করেনি। চতুর্দশ শতকের শেষের দিকে ইসলাম ধর্ম ও সংস্কৃতি তাতাদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। চতুর্দশ শতকে পরিভ্রমণকারী পর্যটকগণ এতদঞ্চলে ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতার নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন। সময়ের বিবর্তনে ইসলামী অনুশাসন, সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতি তাতারদের আকর্ষণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাতার রাজ্য কিপচাক সাম্রাজ্যের (Golden Hordes) পতনের পর উক্ত অঞ্চলের উপর গড়ে উঠা তাতার রাজ্য সমূহের মধ্যে ক্রিমিয়াই ছিল সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাধীন রাজশক্তি। ক্রিমিয়ার এই তাতার বংশের রাজত্বকাল ১৪২০ হতে ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় দীর্ঘ সাড়ে তিন শ’ বছর স্থায়ী হয় এবং সিংকোরাপোলকে রাজধানী করে পর্যায়ক্রমে ৬২ জন তাতার খান ক্ষমতায় অধিষ্টিত থেকে রাজনৈতিক প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হন। কাজান বংশের প্রতিষ্ঠাতা উলুঘ মুহাম্মদের জনৈক ভ্রাতা তাশ- তিমুর তোখতামিশের সেনাপতি ছিলেন এবং তিনিই ক্রিমিয়ায় তাতার বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। জার আইভানকে পরাজিত করে মস্কো জয় গীরাই খান নামে পরিচিত তাতার শাসকদের সাথে পোলান্ডের ডিউক ও উসমানীয় তুর্কী সুলতানগণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে ক্রিমিয়া অবস্থিত হওয়ায় এর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে সবাই সজাগ ছিলেন। বহিঃশত্র“র আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে তাতারগণ দু’লাখ সদস্য বিশিষ্ট দূর্ধর্র্ষ সেনাবাহিনী গঠন করেন যার মাধ্যমে পোলান্ড, রাশিয়া ও কোসাকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান পরিচালিত হয়। এমনকি ১৫৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম দওলত গিরাই এর নেতৃত্বে তাতার বাহিনী রাশিয়ার জার আইভানকে পরাজিত করে মস্কো নগরী বিধ্বস্ত করে দেয় এবং জারকে কর প্রদানে বাধ্য করে। সে সময় ককেসাস, দাগিস্তান ও রুমালিয়ার উপরও তাতারদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া জয়ঃ ১ম ক্যাথরিন অবশেষে কৃষ্ণ সাগরের উপর আধিপত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে  শিয়ার জারিন ক্যাথারিণ ১৭৩৬ ও ১৭৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ক্রিমিয়াকে বিধ্বস্ত করে দেয় এবং ১৭৭১ খ্রিষ্টাব্দে রুশ ও কোসাক বাহিনী ক্রিমিয়ার রাজধানী সিংকোরাপোল দখল করে নেয়। কৃষ্ণ সাগরে রুশদের অবাধে প্রবেশের মহামতি পিটারের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন ক্রিমিয়া দখলের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করল। ক্রিমিয়া স্বাধীন রাজ্য ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে সম্পাদিত কুচকায়নারজির সন্ধিতে ক্রিমিয়া স্বাধীন রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৭৭৪ হতে ১৭৭৬ সাল পর্যন্ত তাতারগন নির্বিঘ্নে ক্রিমিয়া ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ব্যবসা বানিজ্য সম্প্রসারন করেন। নিজেদের সন্তানদেরকে তাঁরা উচ্চ শিক্ষার জন্য বুখারার বিখ্যাত মাদ্রাসায় পাঠাতে থাকেন। এমনকি তাতারদের পূর্ব পুরুষগণ যারা খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন তাঁরা আবার ইসলাম ধর্মে ফিরে আসেন। কিন্তু তাতারদের এ স্বাধীনতা প্রাপ্তি বেশী দিন স্থায়ী হয়নি।

সন্ধি ভঙ্গঃ ২য় ক্যাথরিন পরিশেষে ক্রিমিয়ার খান শাহীন গিরাই এর সাথে তুর্কী সুলতানের মনোমালিন্যের সুযোগে সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ৯ই এপ্রিল জারিনা দ্বিতীয় ক্যাথারিণ ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অন্তর্ভূক্ত করে নেন। উক্ত ঘোষণায় তাতারদের ধর্মীয়, আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার অক্ষুন্ন  কার আশ্বাস দেয়া হলেও তা আদৌ কার্যকর হয়নি। রুশদের অধীনে ক্রিমিয়া বস্তুত রুশদের অধীনে ক্রিমিয়ার তাতার মুসলিম জাতি গোষ্ঠীর পরবর্তী ইতিহাস বড়ই মর্মন্তুদ ও হৃদয়স্পর্শী। জারদের অনিয়ন্ত্রিত বর্বরতায় তাতারগণ সীমাহীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিপীড়নের শিকার হন এমনকি জোর পূর্বক তাতারদের ধর্ম পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়। নিজেদের সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ভিত্তি যখন বিধ্বস্ত হয়ে যায় তখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও দু’লাখ পঞ্চাশ হাজার তাতার মুসলিম নারী-পুরুষ স্বদেশভূমি পরিত্যাগ করে তুরস্ক ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে আশ্রয় নেন। শত নিগ্রহ ও নির্যাতন স্বত্ত্বেও যারা পৈত্রিক বাস্তুভিটা পরিত্যাগ করেনি তাদের উপর নেমে আসে পৈশাচিকতার খড়গ কৃপাণ। ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ শুরু হলে এতদঞ্চল সাময়িক ভাবে তুরস্ক ও ইংরেজদের অধীনে চলে যায়। পরিবর্তিত এ পরিস্থিতি তাতার মুসলমানদের জন্য সৃষ্টি করে নতুন বিপদ। রাশিয়ার বিরুদ্ধে রাজদ্রোহিতার অপরাধে ক্রিমিয়ার তাতারদের অভিযুক্ত করা হয়। জার সন্ত্রাসীগোষ্ঠী জিঘাংসার উন্মত্ততায় নির্বিচারে ধর্ষণ, অগ্নি সংযোগ ও নিপীড়ন চালিয়ে তাতারদের নির্মূল প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে এ Ethning cleansing অভিযান। ইতিহাসবিদ জি, হ্যান্বলী Central Asia শীর্ষক  ন্থে উল্লেখ করেন যে, ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ক্রিমিয়ায় যেখানে তাতার মুসলমানদের সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ, নির্মূল অভিযানের ফলে ১৯১৭ সালে সে সংখ্যা এসে দাঁড়ায় মাত্র এক লাখে। সোভিয়েত সোশ্যালিষ্ট রিপাবলিক ইউনিয়নের (USSR) অন্তর্ভূক্ত ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে বলশেভিকগণ ক্রিমিয়াকে সোভিয়েত সোশ্যালিষ্ট রিপাবলিক ইউনিয়নের (USSR) অন্তর্ভূক্ত করে নেয়। ১৯২০ হতে ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মোট সাত বছর স্বায়ত্বশাসিত প্রজাতন্ত্র হিসেবে ক্রিমিয়া পর্যাপ্ত স্বাধীনতা ভোগ করে। এমনকি রাশিয়ার কমিউনিষ্ট পার্টি ও মিল্লি ফিরকা কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। তাতার ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়া হয় এবং মুসলমানগণ সরকারী উচ্চপদে নিযুক্তি লাভ করেন। কিন্তু দূর্ভাগ্য ক্রিমিয়ার তাতার মুসলমানদের এ সৌভাগ্য বেশী দিন স্থায়ী হয়নি। ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে মস্কো সরকার তাতার জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নির্মূল করার জন্য পূর্বাপেক্ষা কঠোরতম পন্থায় আঘাত হানে। তাতার মুসলমানদের স্বাধীনভাবে বাঁচার স্বপ্নসাধ সাময়িকভাবে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবেরপূর্বে পুরো ক্রিমি য়ায় মসজিদের সংখ্যা ছিল ১৭৫০, বলশেভিক বিপ্লবের পর তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় মাত্র ১০০ তে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ ও ষ্ট্যালিন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় পুরো তাতার জনগোষ্ঠীকে ষ্ট্যালিন নাজী জার্মানীর দালাল হিসেবে অভিযুক্ত করে প্রতিশোধের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৪ সালে ষ্ট্যালিন সরকার ক্রিমিয়ান তাতারদের ভাষাকে সিরিলিক (Cyrillic) অক্ষরে পরিবর্র্তিত করে দেয়। রুশ বুদ্ধিজীবিদের মাধ্যমে ক্রিমিয়দের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে মুছে ফেলা হয়। পারিবারিক জীবনে, সামাজিক বন্ধনে ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রচন্ডরূপে ধ্বস নামে। অতঃপর শুরু হয় তাতার মুসলমানদের পুনঃ উৎখাতের পালা। ষ্ট্যালিনের নির্দেশে তাতার মুসলমানদেরকে নিজ মাতৃভূমি ক্রিমিয়া হতে জোর করে বের করে দেয়া হয়। বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ, যুবা- বৃদ্ধ ও শিশু গণহত্যার শিকার হয়ে পড়ে। অধিকাংশ তাতার বাস্তু-ভিটা ও সহায়-সম্পত্তি হারিয়ে সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিশেষত উযবেকিস্তানে উদ্বাস্তু রূপে আশ্রয় নেয়। তাতারগণ সোভিয়েত শাসনের প্রতি ‘অনুগত’ নয় ষ্ট্যালিনের এ যুক্তিই ছিল নির্বাসনের ভিত্তি। তিনি তাতারদের ‘অবিশ্বস্ত নাগরিক’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এক পরিসংখ্যানে জানা যায় যে, ৫০ হাজার থেকে এক লাখ তাতারকে ষ্ট্যালিন দেশ ত্যাগে বাধ্য করেন। বিপুল সংখ্যক তাতারের জীবন প্রদীপ নিভে যায় কারা অন্তরালে। তখনকার আদমশুমারী অনুযায়ী তাতার  মুসলমানদের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩ শতাংশে। ষষ্টদশ ও বিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে জার রাশিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ক্রিমিয়ার জনগণের প্রতি দমন মূলক শাসন ও পক্ষপাতদুষ্ট আর্থ-সামাজিক নীতি গ্রহণ করেও ব্যাপকভাবে এ অঞ্চলকে রুশীয়করণ করতে ব্যর্থ হয়। অধিকাংশ জনগণ রুশ আত্নীকরণকে দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেন এবং ইসলামী পরিচিতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইসলামী অনুশাসন প্রতিপালনের প্রতি দৃঢ়তার ফলে তাতার জনগোষ্ঠী বিভিন্ন সামাজিক পরিমন্ডলে বসবাস করেও একটি ভারসাম্যপূর্ণ রীতি বজায় রাখতে সক্ষম হন। প্রবল বিপত্তি সত্ত্বেও মুসলমান পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকাকে তাতারগণ গৌরব মনে করেন। ইতোমধ্যে আড়াই লাখ তাতার স্বদেশে ফিরে আসলেও বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে তাঁরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। বাকীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বাধাগ্রস্থ হয়। সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতনের পর ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছে কিন্তু একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে ক্রিমিয়ার তাতারদের স্বাধীনতা তো দূরের কথা নিজ মাতৃভূমিতে তাদের প্রত্যাবাসনের কাজ টুকু পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি। হে আল্লাহ! তুমি ক্রিমিয়ার মুসলমানদের রক্ষা কর। তাদের জন্যে একজন অলী নির্ধারন করে দাও। আমিন।
(সালাহুদ্দিনের ঘোড়া পেইজ থেকে সংগৃহীত)

শিক্গষণীয় গল্প

(1) এক বাদশাহাজাদীর কাহিনী
হযরত শাহ ইবনে শুজা কামরানী (রহ:) ছিলেন এক বিশাল রাজ্যের বাদশাহ। কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় বাদশাহি ত্যাগ করে ফকিরের বেশ ধারন করেন। তার ছিল এক পরমা সুন্দরী এবং পরহেজগার কন্যা। কন্যা বয়ঃপ্রাপ্ত হলে বহু রাজা বাদশাহ তার বিয়ের পরগাম পাঠাতে শুরু করেন। কিন্তু তিনি ঘৃনাভাবে সকল প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। একদিন এক দরিদ্র যুবকের সাথে তার সাক্ষাৎ হল। যুবকের পরহেজগারী তাকে মুগ্ধ করলো। তিনি ঐ যুবকের কাছে তার কন্যার বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। যুবক রাজি হলে তিনি তার সাথে কন্যার বিয়ে পড়িয়ে দিলেন। যুবক নববধুকে নিয়ে নিজ বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করলেন। 
হযরত শুজা (রহঃ) এর কন্যা স্বামীর বাড়ী গিয়ে দেখলেন, এককনে এক টুকরো শুকনো রুটি রাখা আছে। স্বামীকে ঐ রুটির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। স্বামী জানালেন- সারাদিন রোজা আছি। তাই ইফতার করার নিয়তে ঐ রুটির টুকরোটি রেখেছি। স্বামীর উত্তর শুনে মনে হল বাদশাহাজাদী অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তিনি বললেন- আমাকে বাবার কাছে নিয়ে চলুন। যুবক বললেন- আমি পূর্বেই ভেবেছিলাম যে, বাদশাহাজাদি আমার বাড়ী থাকতে পারবে না। এখন দেখছি আমার ধারনা ঠিক। বাদশাহাজাদী বললেন "আপনি ভুল বেঝছেন। আব্বা বলেছিলেন তোমার বিয়ে এক দরবেশ যুবকের সাথে দিচ্ছি। এটা শুনে আমি খুব খুশী হয়েছিলেম, কিন্তু এখন দেখছি আমার স্বামী দরবেশ নন। যদি দরবেশই হবেন, তবে কেন ঘরে রুটি জমা রাখবেন?
যুবক তৎক্ষণাৎ রুটিটি দান করে দিলেন। বাদশাহাজাদীও সন্তুষ্ট চিত্তে ঐ যুবকের সাথে ঘর করতে লাগলেন।
Book Name: তালিমুন নিসা। Page No: 178


(2) বিস্বয়কর ধোর্য্য
হযরত উম্মে সুলাইম (রাঃ) ছিলেন একজন সাহাবীয়া। তার স্বামীর নাম হযরত তালহা (রাঃ) তিনি অত্যান্ত ধৈর্য্যশীলা ও কৃতজ্ঞ মহিলা ছিলেন। তার প্রাণ প্রিয় ছেলে আবু উমাইর (রাঃ) একবার মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। ঘটনাক্রমে তার স্বামী আবু তালহা বাড়ীতে ফেরার পূর্বেই ঐ ছেলে আবু উমাইয়ের মৃত্যু ঘটে। হযরত উম্মে সুলাইম (রাঃ) ধৈর্য্য ধারন করে নিজেই ছেলের গোসল, কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করে ফেললেন এবং গৃহবাসীদের বলে দিলেন- আবু তালহা বিড়িতে ফিরলে কেউ যেন আবু তালহাকে উমায়ের মৃত্যুর খবর না দেয়। কেননা, সাথে সাথে মৃত্যু সংবাদ দিলে হয়ত পানাহার ত্যাগ করে তিনি অস্থির হয়ে পড়বেন। রাতে আবু তালহা বাড়ীতে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন ' আবু উমাইর কেমন আছে? বড়ই শান্তিতে আছেন ' জবাব দিলেন উম্মে সুলাইম (রাঃ)।
 অঅতঃপর রাতের আহারান্তে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়লেন। মিলনও হল। সমস্ত কাজে সমাধা হয়ে গেলে হযরত উম্মে সুলাইম (রাঃ) স্বামীকে লক্ষ্য করে বললেন "আচ্ছা স্বামী আমার! বলুনতো যদি কোন ব্যক্তি কোন গৃহবাসীকে একটা জিনিস নিছক ধার হিসেবে প্রদান করে অতঃপর সেই জিনিসটা ফেরত চায়, তাহলে সেটা ফেরত দেয়া উচিত হবে, নাকি রেখে দেয়ার চেষ্টা করে ভাল হবে?
-নানা অবশ্যই সেটা ফেরত দিতে হবে। আবু তালহা জবাবে বললেন।
-তাহলে আবু উমাইর সম্পর্কে আপনাকে ধৈর্য্য ধারন করতে হবে। আল্লাহর জিনিস আল্লাহ দিয়ে আরার তিনিই ফেরত নিয়েছেন। অত্যন্ত প্রসন্ন মনে স্থিরতার সাথে কথাগুলো বললেন উম্মে সুলাইম (রাঃ)
কিন্তু আবু তালহা (রাঃ) এতে খুবই অসন্তোষ প্রকাশ করলেন- পূর্বে তাকে কেন অবহিত করা হলোনা? প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠেই তিনি হুযুরেপাক (সাঃ) এর দরবারে উপস্থিত হলেন এবং তাকে অবহিত করলেন এ ঘটনা সম্পর্কে। হুযুরপাক (সাঃ) তাকে বললেন "আল্লাহপাক তোমাদেরকে এ রাতে এক বিশেষ বরকত প্রদান করেছেন।"
এর কিছুদিন পরের কথা। আবু উমাইয়ের বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা তাদেরকে সত্যিই একটি পুত্র দান করেন, যার নাম রাখা হয় আব্দুল্লাহ। হুজুরেপাক (সাঃ) এর দোয়ায় আল্লাহর ঐরষে ৭ জন ছেলে হয়েছিল এবং সকলেই ছিলেন হাফেজ কুরআন ও বড় আলেম। 
Book Name: তালিমুন নিসা। Page No: 179


(3) ইসলামের জন্য সীমাহীন ত্যাগ
আরবের কাফিরদের মধ্যে হযরত খোনসা (রাঃ) মহিলা কবি হিসেবে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তিনি তার চার পুত্রসহ মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন। হযরত উমার (রাঃ) এর শাসনামলে কাদেসিয়ার যুদ্ধে তিনি তার চার পুত্রসহ অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধের একদিন পূর্বে তিনি তার পুত্রগণকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে এই বলে উপদেশ দিলেনঃ
"হে আমার কলিজার টুকরোবৃন্দ! তোমরা আনন্দচিত্তে মুসলমান হয়েছো ও হিজরত করেছ। ঐ সত্ত্বার শপথ, যে সত্ত্বা ব্যাতিতি অন্য কোন উপাসক নেই। যেভাবে তোমরা এক মায়ের গর্ভে জন্মলাভ করেছ, ঐভাবে তোমরা এক মায়ের সন্তান। তোমাদের পিতা ভিন্ন অন্য কোন পুরুষ আমাকে স্পর্শ করেনি। তোমাদের বংশ গৌরবের উপরও আমি কোন কলঙ্ক করিনি। তোমাদের জানা আছে, আল্লাহর পথে জিহাদ করা কত সওয়াব। এই দুনিয়া অস্থায়ী এবং পরকালীন জীবন অপেক্ষা অনেক উত্তম। তোমাদের সকলের একদিন মৃত্যু-স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।

রবিবার, ১৯ মার্চ, ২০১৭

সূরা যিলযাল (ভূমিকম্প) সূরা-৯৯, মাক্কী

 পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)

সূরা যিলযাল (ভূমিকম্প) সূরা-৯৯, মাক্কী 

উচ্চারণ : (১) এযা ঝুলঝিলাতিল আরযু ঝিলঝা-লাহা (২) ওয়া আখরাজাতিল আরযু আছক্বা-লাহা (৩) ওয়া ক্বা-লাল ইনসা-নু মা লাহা? (৪) ইয়াওমাইযিন তুহাদ্দিছু আখবা-রাহা (৫) বেআন্না রববাকা আওহা লাহা (৬) ইয়াওমায়িযিইঁ ইয়াছদুরুন না-সু আশতা-তাল লেইউরাও আ‘মা-লাহুম (৭) ফামাইঁ ইয়া‘মাল মিছক্বা-লা যার্রাতিন খায়রাইঁ ইয়ারাহ (৮) ওয়ামাইঁ ইয়া‘মাল মিছক্বা-লা যার্রাতিন শার্রাইঁ ইয়ারাহ ।



অনুবাদ : (১) যখন পৃথিবী তার (চূড়ান্ত) কম্পনে প্রকম্পিত হবে। (২) যখন ভূগর্ভ তার বোঝাসমূহ উদ্গীরণ করবে। (৩) এবং মানুষ বলে উঠবে, এর কি হ’ল? (৪) সেদিন সে (তার উপরে ঘটিত) সকল বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে। (৫) কেননা তোমার পালনকর্তা তাকে প্রত্যাদেশ করবেন। (৬) সেদিন মানুষ বিভিন্ন দলে প্রকাশ পাবে, যাতে তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম দেখানো যায়। (৭) অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা সে দেখতে পাবে (৮) এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও সে দেখতে পাবে।’

Copyright @ 2013 Just Islam.