(1) যার জন্য কাজ করি, তিনি জানেন:
কাদিসিয়ার যুদ্ধে হেরে গেছি, ব্যাবিলন থেকে সরে এসেছি- তাতে এমন কি হয়েছে ? রাজধানী মাদায়েন এখনো রয়ে গেছে আমাদের দখলে। হাজার হাজার সৈন্য আছে সেখানে। ইরানীরা নতুন করে সাহস সঞ্চয় করে। বারবার মুসলমানদের হাতে মার খেয়েও নতুন আশায় বুক বাধে । কেউ কেউ বলল - দজলা নদির নৌকা গুলো ডুবিয়ে দাও। ভেঙ্গে ফেল নদী পারাপারের সেতু । বন্ধ কর ওদের নদী পারাপারের সমস্ত পথ। এতকিছু করেও যেন ইরানীরা ভরসা পায় না। অগণিত সৈন্য মাদায়েনে এসে জড় হয়। নদীর ঘাটে, দুর্গের মধ্যে, শহরেরে আনাচে কানাচে তারা ওত পেতে বসে থাকে।
এদিকে মুসলিম সেনারা নদির ধারে এসে তো একেবারে থ। কোথাও নৌকা নেই। নদী পারাপারের সেতুটিও ইরানীরা ভেঙ্গে ফেলেছে। আশেপাশে কোথাও নৌকা মেরামতের, জাহাজ তৈরির মাল-মসলা পাওয়া গেল না। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে তারা স্পষ্ট শুনতে পায় শো শো গর্জন। প্রকান্ড ঢেউ গুলো একটার পর একটা আছড়ে পড়ছে। স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে বড় বর গাছ। সেনাপতি সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা) পড়ে গেলেন মহা সমস্যায়। কিন্তু পাহাড় সমান বাধাও মুসলমানদের আটকে রাখতে পারে না। খাঁটি মুসলমানেরা এখনো মৃত্যুকে পরোয়া করে না। তারা জানেনা পেছনে ফিরতে। যা কিছু মানুষের কল্পনার বাইরে, ঈমানের জোরে তাকেই মুসলমানেরা বাস্তবে রুপ দেয়। সম্ভব করে তোলে অসম্ভবকে।
সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা০ বললেন- ভায়েরা আমার, শত্রুরা দাজলার ওপারে গিয়ে ঘাঁটি গেড়েছে। ছিন্ন করে দিয়েছে পারাপারের সমস্ত রাস্তা। ওরা কৌশলে আমাদের হটিয়ে দিতে চায়। আমরা চলে গেলেই ওরা আবার সচল হয়ে উঠবে। আমাদের নাজেহাল করবে নানাভাবে। তোমরা তৈরি হউ। আল্লাহর মানে ঝাপিয়ে পড় নদীর বুকে।
"আল্লাহু আকবার" ধ্বনি তুলে প্রথমে ঝাপ দিলেন সেনাপতি সা'দ। অন্যরা তাকে অনুসরন করে। ঝাঁপিয়ে পড়ে দাজলার বুকে। শ্রোতের শো শো শব্দ ছাপিয়ে শোনা গেল ঝুপঝাপ আওয়াজ। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ইরানীরা এতক্ষন হাসাহাসি করছিল। কখন কিভাবে মুসলমানদের ওপর চড়াও হবে- একথায় ওরা ভাবছিল। সুসলমানদের এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখে ওরা আঁতকে ওঠে। কেউ কেউ চাপা গলায় বলে ওরা কি মানব না দানব ?
দেখতে দেখতে মুসলমানেরা মাঝ নদী পার হয়ে আসে। ভয়ে ভয়ে ইরানীরা চীৎকার করে ওঠে - দানব আসছে ! দানব আসছে !! যারা দুর্গের মধ্যে ছিল, রাজধানী বা রাজপ্রাসাদে ওঁত পেতে ছিল - তারাও শুনতে পেল এই ভয়াল চীৎকার। ইরানী সেনাপতি বলল - তৈরি হও তির ছোড়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ইরানীরা ততক্ষণে দৌড়াতে শুরু করেছে। যে যেদিকে পারে ছুটে পালায়। সম্রাট ও রাজধানী ছেড়ে পেছন দরজা দিয়ে পালিয়ে গেল। মুসলমানেরা রাজধানী মাদায়েনে প্রবেশ করল। দখল করে নিল রাজপ্রাসাদ। হঠাত করেই একজন সৈনিকের নজরে পড়ল অতি দামি একটি জিনিস। ইরানী শাহানশাহের রাজমুকুট। দামী দামী অনেক মণি-মুক্তা বসানো থাকে মুকুটে। এই মুকুট যার মাথায় থাকে তিনি হলেন দেশের সম্রাট। সৈনিক টি অতি যত্নে মুকুট টি হাতে তুলে নিলেন। সকলের অগচরে তিমি মুকুট টি তুলে দিলেন সেনাপতি সা'দ বিন আবু অয়াক্কাস (রা) হাতে। সৈনিকের সততায় সা'দ অবাক হলেন। বললেন তুমি কে? কি তোমার নাম? সোনিকটি নাম বললেন না। পরিচয় দিলেন না। মুখটি পর্যন্ত ভালোভাবে দেখালেন না। দরজার দিকে মুখ করে বিনয়ের সঙ্গে বললেন- আপনার কাছে নাম বলে কি লাভ? যার জন্য আমি এ কাজ করেছি তিনি আমার নাম জানেন। কথা কয়টি বলে সৈনিকটি শা শা করে বেরিয়ে গেলেন। শত চেষ্টা করেও সা'দ তার নাম জানতে পারলেন না। পরিচয় খুজে পেলেন না।
এমনি ছিল রাসুল (সা) এর সাহাবাগনের আচার-আচারণ। সুনাম সুখ্যাতির কোন লোভ তাদের ছিলনা। নিজেদের ভালো কাজগুলি জানাজানি হতে দিতেন না। তারা কাজ করতেন আল্লাহ কে খুশি করার জন্য। বিনিময়ে চাইতেন আল্লাহর কাছে। রাসুল (সা) এর সেই হাদিসটি মেনে চলতেন অক্ষরে অক্ষরে- " এমনভাবে দান কর, যাতে ডান হাত দিয়ে দান করলে বাম হাত টের না পায়।"
সাঈদ বিন যাইয়েদ (রা) ছিলেন তাদেরই একজন। ইসলাম গ্রহণ করার কারনে কাফিরদের হাতে নির্যাতন ভোগ করেছেন। দিন কাটিয়েছেন খেয়ে না খেয়ে। এখনো আবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিহাদ করছেন, দেশ শাসন করছেন, শরিক হয়েছেন ইসলাম প্রচারের কাজে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তার নাম খুব কমই লেখা আছে। অথচ তিনি ছিলেন আশারা মুবাশশারা বা দশ জান্নাতীর একজন। দুনিয়াতে থাকতেই যারা পেয়েছিলেন বেহেশতে যাওয়ার সুসংবাদ। মোট দশজন সাহাবীকে 'আশারা মুবাশশারা' বলা হয়ে থাকে। আরবিতে আশারা মানে দশ আর মুবাশশারা মানে সুসংবাদ প্রাপ্ত।
কে জানত যে সাইদ (রা) এত বড় হবেন! কেউ কি ভাবতে পেরেছিলেন যে এই সাঈদ হবেন ইসলামের একজন প্রথম কাতারের সৈনিক, রাসুল (সা) এর একজন ঘনিষ্ঠ সাহাবা। আর সে কারনেই সাঈদ কখন কবে জন্মগ্রহণ করেন কেউ তা মনে রাখেনি। প্রয়োজন বোধ করেনি লিখে রাখার। তবে অনুমান করা হয় যে ছয়শত এক সালে মক্কায় কুরাইশ বংশে জন্ম গ্রহণ করেন। সেই হিসেবে তিনি রাসুল (সা০ এর চেয়ে ত্রিশ বছরের ছোট। মাত্র পনের কি ষোল বছর বয়সে তিনি নবীজীর হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করেন। সাঈদের পিতার নাম যায়েদ। মায়ের নাম ফাতেমা বিনতে বাজাহ।
(2)অন্ধকার যুগের খাটি মানুষ:
সাঈদের পিতা যায়েদের অবস্তা খুব বেসি ভাল ছিল না। খেয়ে পরে কোন রকমে দিন কাটাত। কিন্তু যায়েদের মনটি ছিল খুবই বড়। সমাজের ভাল মন্দ, উচিত-অনুচিত বিষয়গুলো নিয়ে গভির চিন্তা করতেন। অন্যরা যখন মদ খেত, জুয়া খেলত, সরাইখানায় নাচে-গানে মেতে উঠত, যায়েদ তখন নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কে এই গাছ গাছালি, পাহাড় পর্বত সৃষ্টি করলেন? কার হুকুমে ফসল ফলে? কলকল শব্দ করে ঝরনার ধারা নেমে আসে কার ইশারায়? দেবতার ক্ষমতা কতটুকু? মানুষ মেরে কি লাভ? এসব বিষয়ে তিনি চিন্তা করতেন। চিন্তা করতে করতে দিশেহারা হয়ে পড়তেন। চিন্তার জগতে বারবার হাবুডুবু খেতেন। কিন্তু কুল-কিনারা পেতেন না।
আসলে এই চিন্তাগুলোই যায়েদ (রা) কে খাঁটি মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিল। তাকে সরিয়ে রেখেছিল অন্ধকার যুগের বর্বরতা এবং অনাচারের পংকিলতা থেকে। কাফির মুশরিকদের মধ্যেও বসবাস করেও তিনি এখনো কুফরি করেননি, শিরক করেননি। এমনকি মুশরিকরা দেবতার নামে ছাগল, ভেড়া বলি দিলেও তিনি তা স্পর্শ করতেন না।
রাসুল (সা) এর ওপর তখনো অহি নাযিল হয়নি। সে সময়কার একটি ঘটনা। আরবের একটি এলাকার নাম ওয়াদীয়ে বালদাহ। কি এক কাজে রাসুল (সা) সেখানে গেলেন। চেনাজানা লোকেরা তাকে খাবার খেতে দিলেন। সাঈদের পিতা যায়েদ (রা) ও সেখানে ছিলেন। নবীজী খোজ নিয়ে জানলেন- পশুটিকে দেবতার নামে বলি দেয়া হয়েছে। অমনি তিনি মাংসের টুকরোগুলো বাটিতে তুলে রাখলেন। বললেন মুর্তির নামে জবাই করা মাংস আমি খাই না। যায়েদেরও সেই একই কথা। তিনিও মাংস গ্রহণ থেকে বিরত থাকলেন। সেই অন্ধকার যুগেও এমনি নিখাদ ছিল যায়েদ (রা)- এর জীবন।
(3) তিনি ছিলেন অতি দয়াবান:
সে আমলে মেয়েদের কোন কদর ছলনা। সমাজে কেউ তাদের দাম দিত না। মক্কার লোকেরা তাদের মেষ, ছাগল ও ঘোড়াগুলো যত যত্নের সঙ্গে লাল্লন-পালন করত, মেয়েদের ততটুকু যত্ন করত না।। মহিলাদের তারা মারধর করত যখন তখন। নানী-দাদী, মা-মামীরা ঠিকমতো কাজ না পারলে, পুরুষদের কথা না শুনলে ঘাড় ধরে ঘর থেকে বের করে দিত। তাড়িয়ে দিত বাড়ি থেকে। কখনো আবার যেনতেন দামে বিক্রি করে দিত বিদেশিদের কাছে। কারো ঘরে কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তো আর কথাই নেই। আতুড়ঘরেই তাকে গলা টিপে, নয়ত মাটিতে চাপা দিয়ে মেরে ফেলত। কখনো কখন পুরুষেরা কঠিন শর্তে মেয়েদের বিয়ে করত। বলত- যদি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়, তাহলে সমস্ত আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত দিতে হবে। দেশের বাছা বাছা নেতারাও থাকবে এখানে। সবার সামনে মা মেয়েকে নিজের হাতে গলা টিপে, নয়ত বুকে ছুরি চালিয়ে হত্যা করবে। রাজী তো? রাজী না হয়েই বা উপায় জি? কে তার মেয়েকে আইবূড়ো করবে ঘরে রেখে? মক্কার লোকেদের এসব কাজ করবার যায়েদের একদম ভাল লাগে না। এসব দেখে দেখে একেবারে হাপিয়ে উঠেন তিনি। কখনো কখনো লোকনকে বোঝান। সুযোগ পেলে প্রতিবাদ করেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা? উল্টো তাকেই নাকানি-চুবানি খেতে হয়। তাকে শুনতে হত তাদের হাজার রকমের গালমন্দ।
তবু যায়েদ (রা) এর মন মানে না। মা-বোনদের অসহায় অবস্তা, কন্যা সন্তানদের করুণ পরিনতির কথা ভাবতে গেলেই তার প্রাণ কেঁদে উঠে। তিনি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ান। যদি শোনেন যে কারও কন্যা সন্তান হয়েছে, তাকে মেরে ফেলবে আঁতুড়ঘরে, তখনি তিনি ছুটে যান সেখানে। মেয়ের পিতার হাতে-পায়ে ধরে মেয়েকে নিয়ে আসেন নিজের বাড়িতে। আদর যত্ন করে লালন-পালন করেন। যখন বড় হয় মেয়েকে নিয়ে যান আসল বাবা-মায়ের কাছে। বলেন- যদি চাও মেয়েকে ফিরিয়ে নিতে পার। নইলে রেখে দাও আমার কাছে। বাবা-মা কখনো মেয়েকে গ্রহণ করে, কখনো আবার দূর দূর করে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়। যায়েদ (রা) তখন নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। দেখে শুনে নিজের খরচে মেয়ের বিয়ে দেন। বিনিময়ে তিনি কিছু গ্রহণ করেন না। একটি পয়সাও নেন না কারো কাছ থেকে।
(4)মার খেলেন কুরাইশদের হাতে:
দিন যত যায় কুরাইশদের সঙ্গে যায়েদের মতভেদ তত বাড়তে থাকে। কুরাইশদের আচার-আচরণ,কাজ-কারবার, চিন্তাভাবনা কোনকিছুইযায়েদ (রা) এর ভাল লাগেনা। কুরাইশরা যা করে, যায়েদ তা পছন্দ করেন না। যায়েদ যা চান, কুরাইশরা তার ধার দিয়েও হাটে না। অবশেষে এমন হল যে, যায়েদ যখন তখন তার মনের কথা গুল বলে ফেলেন। এ নিয়ে যায়েদের মাঝে মধ্যেই বিপাকে পড়তে হয়। কখনো বা খেতে হয় কিল-ঘুষি, চড়-থাপ্পড়। মক্কার একটি উৎসবের সময় ঘটে যায় এমনি একটি ঘটনা।
প্রতিবছরের মত এ বছরেও কা'বা প্রাঙ্গনে মেলা বসবে।। দূর দূর থেকে লোকজন আসবে। নারীপুরুষের কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠবে কা'বার প্রাঙ্গণ। দেখতে দেখতে উৎসবের দিন ঘনিয়ে এল। মক্কার আনাচে কানাচে হৈ হৈ রব পড়ে গেল। ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে বাজারে যায়। হরেক রকমের সওদা কেনে। নিজেরা সাজে, পশুগুলোকে সাজায়।
উৎসবের দিন হাটি হাটি পাপা করে যায়েদও গিয়ে হাযির হলেন কা'বার প্রাঙ্গণে। তার কোন সাজ নেই। গায়ে উথেনি নতুন পোশাক। ভেড়া-ঘোড়া, উঠ-গাধা কিছুই সঙ্গে নেই। কা'বা ঘরের পাশে দাড়িয়ে থাকেন তিনি। আস্তে আস্তে ভিড় বাড়ছে। দলে দলে জমায়েত হচ্ছে নারীপুরুষ। বিচিত্র সাজে তারা সেজেছে। পুরুষেরা মাথায় বেঁধেছে দামী রেশমি পাগড়ী। গেয়ে জড়িয়েছে মূল্যবান ইয়ামনি চাদর। নারী ও শিশুদের গায়ে হরেক রকমের পোশাক। হাটে, পায়ে, গলায়-মাথায় দামী দামী গয়না। সাজের বাহার থেকে পশুগুলোও বাদ পড়ল না। ধুয়ে মুছে গাধা-ঘোড়ার গা পরিস্কার করেছে। কোনটির গলায় ফুলের মালা, কপালে শরীরে দামী রঙ্গীন কাপড়। কোনটিকে আবার লাল-নীল চমৎকার ভাবে সাজিয়েছে। কা'বা ঘরের প্রাঙ্গণে নানা বর্ণে নানা রঙ্গে রঙ্গিন হয়ে ওঠে। সাজের সে বাহার দেখলে চোখ ঝলসায়। মন ফুরফুর করে। ছেলেমেয়েদের মনে তখন সে কি আনন্দ। তারা হাত ধরাধরি করে হাসে-নাচে, গান গায়। ঠেলতে ঠেলতে ভেড়া-ঘোড়া, ঊট-গাধাগুলো নিয়ে দেব-দেবির সামনে। ঝকঝকে ছুরিগুলো বারবার শান দেয়। হাতের আঙ্গুলে ধার পরখ করে দেখে। একটু পরেই পশুগুলোরে গলায় ছুরি চালাবে। বলি দেবে দেব-দেবীর নামে।
দূরে দাঁড়িয়ে যায়েদ (রাঃ) সবকিছু দেখেন। একে একে তার মনে জেগে ওঠে হাজার প্রশ্ন। দেবতাদের কি শক্তি আছে? ওগুলো তো কাদা-মাটি-পাথর দিয়ে আমরাই বানিয়েছি। সেই কবে থেকেই তো ওরা ওভাবে দাঁড়িয়ে আছে। একটু নড়েও না চড়েও না। আমরাই তো মাঝে মাঝে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে নেই। ঝাড়মোছা করে পরিস্কার করে রাখি। আমরা এত সাজি, এত হাসি, গান গাই। কই, ওরা একবারও সাড়া দেয়না। ওরা আমাদের কি এমন ভালো করেছে? অনিষ্ট করার ক্ষমতাই বা ওদের কোথায়। যে ভালো মন্দ কিছুই করতে পারেনা- তার সামনে মাথা নত করে কি লাভ? কি হবে পশুগুলো বলি দিয়ে? কিন্তু কাকে তিনি প্রশ্ন করবেন? কে দেবে তার প্রশ্নের উত্তর?
যায়েদ (রা) তবু নিরব থাকতে পারেন না। ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে পড়েন। দেবদেবীদের পাশে, যেখানে দাঁড়িয়ে পশুগুলো বলি দেবে, সেখানে গিয়ে দাঁড়ান। কা'বা ঘরের দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে বলেন- ভাইয়েরা আমার। শোন একটা কথা দেবতাদের আমরাই বানিয়েছি। কিন্তু পশুদের কে বানিয়েছে? আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ছে। জমিনে ঘাস বড় হয়েছে। দেবতাদের কি করার আছে? ওরা কি এগুলো বানিয়েছে না বাঁচিয়ে রেখেছে? তোমরা কার জিনিস কাকে দান করছো? এটা তোমাদের কেমন আহাম্মকি? একদমে কথা গুলো বলে যায়েদ (রা) থামলেন। যারা হাসাহাসি নাচানাচি করছিল তারা এসব কথা শুনতে পেল না। কিন্তু যারা পশুগুলো বলি দ্যার জনয তৈরি হচ্ছিল, তারা ঠিকমত শুনতে পেল। উমর (রাঃ) এর পিতা খাত্তাবও ছিলেন সেখানে। যায়েদের কথাগুলো শুনতেই তার মেজাজ বিগড়ে যায়। হাটে পশুটি ছেড়ে দিয়ে রাগে গড় গড় করতে করতে ছুটে আসেন যায়েদের কাছে। দাঁতে দাঁত চেপে, চোখ মুখ কিটমিট করতে করতে বললেন-এমন অলক্ষুণে কথা আর কত শুনব। আমাদের তো সহ্যের একটা সীমা আছে। যা হতভাগা! তোর সর্বনাশ হোক। কথাগুলো শেষ হতে না হতেই যায়েদের গালে বসিয়ে দেন এক থাপ্পড়। যায়েদ (রাঃ) নিরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ তাকে সাহায্য করল না। দাড়াল না তার পাশে এসে। বরং তারা যেন খুশিই হল। হেসে উঠল হোহো করে।
(5) তাড়িয়ে দিল গ্রাম থেকে:
যায়েদ (রা) কে থাপ্পড় মেরেই তারা শান্ত হল না। মক্কার যুবকদেরকে যায়েদের পেছনে লেলিয়ে দেয়। যায়েদকে দেখলেই তারা আজেবাজে নানান কথা বলে। কোন না কোন ভাবে ঝগড়া বাঁধানোর বাহানা খোঁজে। এদিকে সবাই মিলে যায়েদ (রা) কে একঘরে করে ফেলল। যায়েদ কারো কাছে গেলে, কারো বাড়িতে গেলে কেউ তার সঙ্গে কথা বলে না। পারলে দুরদুর করে তাড়িয়ে দেয়। পথে ঘাঁটে দেখা হলে মুখ ভার করে থাকে। যায়েদ (রা) গায়ে পড়ে দশটি কথা বললে একটি কথার জবাব আসেনা। যায়েদ (রা) এর তবুও বিরাম নেই, যখন যা মনে আসে তখন তাই বলেন। এদিকে খাত্তার, শোহেলী এবং অন্যান্য সরদারদের জেদ বাড়তে থাকে। সবাই মিলে স্থির করল ছলে বলে কৌশলে যে করেই হোক, যায়েদ (রা) কে দেশ ছাড়া করতে হবে। নইলে আমাদের রক্ষা নেই। দেবতারা একবার রেগে গেলে হাজার গাধা বলি দিয়েও থামানো যাবেনা। গোটা দেশটাই তখন লাটে উঠবে। আমাদের জীবনেও নেমে আসবে চরম দুর্দিন।
যায়েদ (রা) কি আর করেন। বাধ্য হয়ে বাড়ি ঘরের মায়া, ছেলেমেয়েদের মায়া বিসর্জন দিলেন। আশ্রয় নিলেন হেরা পাহাড়ে। সেখানেই কাটারে লাগলেন নিঃসঙ্গ দিনগুলো। সরদারেরা তাকে তাড়িয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না। তিনি যাতে আর ফিরে না আসতে পারেন, কেউ যাতে তার কাছে না যায়- সে ব্যাবস্থাও করল। শহরের শেষ সীমানায় কয়েকজন যুবককেও বসিয়ে দিল। বলে দিল যে- যায়েদের চোখে চোখ রাখবে। ওকে মক্কায় আসতে দেবে না। আসতে চাইলে আচ্ছা রকম পিটিয়ে ঠ্যাঙ ভেঙ্গে দেবে।
(6) গোপন পরামর্শঃ
সরদারদের কথামত যুবকেরা শহরের শেষ সীমানায় বসে থাকে। আনন্দ ফুর্তি করে। মদ খায়, মাতলামি করে। যায়েদ (রা) ও তাকে তাকে থাকেন। হঠাত করেই একদিন যুবকদের দৃষ্টি এড়িয়ে সকলের অগোচরে চলে আসেন শহরে। ওয়ারাকা ইবনে নাওফল আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাম এবং উসমান ইবনুল হারিসের সঙ্গে তার বেশ ভাব ছিল। তিনি চুপি চুপি এদের সঙ্গে দেখা করেন। আলাপ করেন দেশের হালচাল ও গোমরাহী সম্পর্কে।
শুরু হল আলাপ আলোচনা যুক্তি তর্ক। অবশেষে যায়েদের সঙ্গে সবাই একমত হলেন। যায়েদ বললেন আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, এ জাতি অধঃপতনের শেষ সীমানায় পৌছে গেছে। আসল ধর্ম কে বিকৃত করেছে। কুপ্রথাকে পরিনত করেছে ধর্মের মূল বিষয়ে। এভাবে আমরেয়া বাচতে পারব না। যদি ধ্বংস থেকে নাজাত পেতে চাম, তাহলে চলুন- আমরা দ্বীনের খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। তড়িঘড়ি করে তিনজনই তৈরি হলেন। ঘর ছাড়লেন সত্যের সন্ধানে।
(5) তাড়িয়ে দিল গ্রাম থেকে:
যায়েদ (রা) কে থাপ্পড় মেরেই তারা শান্ত হল না। মক্কার যুবকদেরকে যায়েদের পেছনে লেলিয়ে দেয়। যায়েদকে দেখলেই তারা আজেবাজে নানান কথা বলে। কোন না কোন ভাবে ঝগড়া বাঁধানোর বাহানা খোঁজে। এদিকে সবাই মিলে যায়েদ (রা) কে একঘরে করে ফেলল। যায়েদ কারো কাছে গেলে, কারো বাড়িতে গেলে কেউ তার সঙ্গে কথা বলে না। পারলে দুরদুর করে তাড়িয়ে দেয়। পথে ঘাঁটে দেখা হলে মুখ ভার করে থাকে। যায়েদ (রা) গায়ে পড়ে দশটি কথা বললে একটি কথার জবাব আসেনা। যায়েদ (রা) এর তবুও বিরাম নেই, যখন যা মনে আসে তখন তাই বলেন। এদিকে খাত্তার, শোহেলী এবং অন্যান্য সরদারদের জেদ বাড়তে থাকে। সবাই মিলে স্থির করল ছলে বলে কৌশলে যে করেই হোক, যায়েদ (রা) কে দেশ ছাড়া করতে হবে। নইলে আমাদের রক্ষা নেই। দেবতারা একবার রেগে গেলে হাজার গাধা বলি দিয়েও থামানো যাবেনা। গোটা দেশটাই তখন লাটে উঠবে। আমাদের জীবনেও নেমে আসবে চরম দুর্দিন।
যায়েদ (রা) কি আর করেন। বাধ্য হয়ে বাড়ি ঘরের মায়া, ছেলেমেয়েদের মায়া বিসর্জন দিলেন। আশ্রয় নিলেন হেরা পাহাড়ে। সেখানেই কাটারে লাগলেন নিঃসঙ্গ দিনগুলো। সরদারেরা তাকে তাড়িয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না। তিনি যাতে আর ফিরে না আসতে পারেন, কেউ যাতে তার কাছে না যায়- সে ব্যাবস্থাও করল। শহরের শেষ সীমানায় কয়েকজন যুবককেও বসিয়ে দিল। বলে দিল যে- যায়েদের চোখে চোখ রাখবে। ওকে মক্কায় আসতে দেবে না। আসতে চাইলে আচ্ছা রকম পিটিয়ে ঠ্যাঙ ভেঙ্গে দেবে।
(6) গোপন পরামর্শঃ
সরদারদের কথামত যুবকেরা শহরের শেষ সীমানায় বসে থাকে। আনন্দ ফুর্তি করে। মদ খায়, মাতলামি করে। যায়েদ (রা) ও তাকে তাকে থাকেন। হঠাত করেই একদিন যুবকদের দৃষ্টি এড়িয়ে সকলের অগোচরে চলে আসেন শহরে। ওয়ারাকা ইবনে নাওফল আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাম এবং উসমান ইবনুল হারিসের সঙ্গে তার বেশ ভাব ছিল। তিনি চুপি চুপি এদের সঙ্গে দেখা করেন। আলাপ করেন দেশের হালচাল ও গোমরাহী সম্পর্কে।
শুরু হল আলাপ আলোচনা যুক্তি তর্ক। অবশেষে যায়েদের সঙ্গে সবাই একমত হলেন। যায়েদ বললেন আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, এ জাতি অধঃপতনের শেষ সীমানায় পৌছে গেছে। আসল ধর্ম কে বিকৃত করেছে। কুপ্রথাকে পরিনত করেছে ধর্মের মূল বিষয়ে। এভাবে আমরেয়া বাচতে পারব না। যদি ধ্বংস থেকে নাজাত পেতে চাম, তাহলে চলুন- আমরা দ্বীনের খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। তড়িঘড়ি করে তিনজনই তৈরি হলেন। ঘর ছাড়লেন সত্যের সন্ধানে।
Book: বেহেশতের সুসংবাদ পেলেন যারা।
Part: One
Writter: মুহাম্মদ লুতফুল হক।


0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন